রাজা রামমোহন রায় । উপমহাদেশের রেনেসা নায়ক

রাজা রামমোহন রায় । উপমহাদেশের রেনেসা নায়ক

রাজা রামমোহন রায় এর জীবনী, তার ধর্ম সংস্কার, সমাজ সংস্কার, সতীদাহ প্রথা রদ করা, শিক্ষা ও কর্ম জীবন, বিলেত ও ফ্রান্স ভ্রমন ইত্যাদি আমাদের এখনো আন্দোলিত করে ও কৈতুহল জাগায়। তাই এই বিষয় গুলিকে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো।

 

রাজা রামমোহন রায়, যার কথা মনে হলেই চোখে ভেসে উঠে  এমন এক জন মানুষ যে তারা সর্বাত্বক চেষ্টার দ্বারা সতীদাহ প্রথার মতো কুপ্রথা বন্ধ করেছিলেন। হিন্দু সমাজের মেয়েদের এক অকাল অপমৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন। সেই সময়ে তার প্রজ্ঞা, জ্ঞানের প্রতি আগ্রহ, যুক্তিবাদি চিন্তা, সংস্কারক ভাবনা সমাজকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো। তাই তাকে উপমহাদেশের রেনেসার নায়ক বললে অতিউক্তি করা হয় না।

 

রাজা রামমোহন রায় স্মৃতি যাদুঘর
রাজা রামমোহন রায় স্মৃতি যাদুঘর; Image: https://www.justdial.com/

 

রাজা রামমোহন রায় এর জন্মঃ

 

রাজা রামমোহন রায় ১৭৭২ সালের ২২ মে মামার বাড়ি শ্রীরামপুরে জন্ম গ্রহন করেন। তার বাবার বাড়ি হুগলি জেলার রাধানগর গ্রামে। বর্তমানে এই দুই গ্রামই পশ্চিম বঙ্গে পরেছে। তার বাবা রামকান্ত রায় ছিলেন বৈষ্ণবী এবং মা তারনী দেবী ছিলেন শক্ত গোত্রের। সেই দিক থেকে বলতে হয় রাজা রামমোহন সম্ভ্রান্ত ব্রাহ্মন পরিবারে জন্ম নিয়ে ছিলেন।

 

তাদের বংশের পদবি আগে বন্দোপাধ্যায় হলেও ধারনা করা হয় রাজা রামমোহনের প্রপিতামহ কৃষ্ণকান্ত বাংলার সুবেদারের আমিনের কাজ করতেন। সেই সুবাদে তিনি নিজের নামের পদবি রায় করেন। সেই থেকে রাজা রামমোহন রায়দের পারিবারিক পদবি ছিলো রায়। তারা খুব ধার্মিক ও রক্ষনশীল পরিবার ছিলো। রামকান্ত রায় দিনের বেশিরভাগ সময় ধর্ম চর্চায় কাটাতেন আর মতা তারনী দেবির ধর্ম পরায়নতার সুনাম সেই সময়ে এলাকা জুরে ছিলো।

 

রাজা রামমোহন রায় এর শিক্ষা জীবনঃ

 

আমরা যে সময়ের কথা বলছি,সেই সময়ে এখনকার মতো স্কুল কলেজের ছড়াছড়ি ছিলো না। যাও কিছু ইংরেজি স্কুল ছিলো তাতে নেটিজেনদের যাবার অনুমতি ছিলো না। তখন ভরসা ছিলো, পন্ডিত মশায়ের পাঠশালা, ভট্টাচার্জ দের চতুষ্পাঠি আর মুসলমানদের আরবি ফারসির মক্তব। মুসলমানরা পাঠশালায় যেতো না, কিন্তু দীর্ঘদিন ভারত মুসলিম শাসনে ছিলো বলে হিন্দুদের মধ্যে সরকারি চাকরির লোভে আরবি ফারসি শেখার প্রবনতা ছিলো।

 

রাজা রামমোহন রায় এর শিক্ষা জীবন শুরু হয় পাঠশালায়। পন্ডিতের নাম ছিলো নন্দকুমার বিদ্যালংকার। তার কাছে সংস্কৃতি শিক্ষা লাভের পরে নয় বছর বয়সে পাঠনায় চলে যান আরবি ও ফারসি শিখতে। মজার ব্যাপার হচ্ছে এই বয়সেই রামমোহন রাতের দুইটি বিয়ে করা হয়েগেছিলো। প্রথম স্ত্রী অকালে মারা গেলে তাকে দ্বিতিয় বিয়ে দেয়া হয়।

 

রাজা রামমোহন রায় বহু বিবাহ ও বাল্য বিবাহ দুইটি করলেও সেই সময়ে ছিলো নিতান্ত ছোট। বাবার মুখের উপর কথা বলার মতো সাহস ও জ্ঞান তার ছিলো না। জ্ঞানের অভাবেই যে প্রতিবাদ করা হয়নি, তা বুঝা আয় পরবর্তিতে পিতার সামনেই পিতার ধর্মের কুসংস্কার গুলি নিয়ে কথা বলেছিলেন বলে। পরিনত বয়সে সে বাল্য বিবাহ ও বহু বিবাহ বন্ধ করার জন্য সংগ্রাম করে গেছেন।

 

রাজা রামমোহন রায় প্রতিকৃতি
রাজা রামমোহন রায় প্রতিকৃতি; Image: https://www.youtube.com/

 

যাই হোক, তিনি পাঠনা থেকে ফিরে এসে আবার ১২ বছর বয়সে কাশী চলে যান আরো ভালো করে সংস্কৃতি শিখবেন বলে। এখানে তিনি মুসলমানদের একেশ্বরবাদের সাথে হিন্দুদের একেশ্বরবাদের কিছু মিল দেখতে পান। তার এই ত্রিমুখি শিক্ষা তার চিন্তাকে নানা ভাবে অরভাবিত করতে থাকে। তার বাবাও পরে জান বিপদে, কুলীন ব্রাহ্মনের প্রত্র হয়ে হয়ে সে নানা প্রশ্ন করে জরজড়িত করতে থাকেন তার বাবাকে। 

 

বিরক্ত হয়ে রামকান্ত ছেলেকে বাড়ি থেকে বেড় করে দেন। কিছু টাকা পয়সা নিয়ে রাজা রামমোহন নেপালে চলে আসেন। এখানে সে বৌদ্ধ ধর্মে দিক্ষা নেবার জন্য তিব্বতে চলে যান। আসলে তার জীবন কেটেছে একটা ধর্মিয় ঘোরটোপে,ফলে সে ধর্ম নিয়ে চিন্তা ও পড়াশুনায় আগ্রহ পেতো বেশি। আবার নানা বিষয়ে জানার পর তার যুক্তিবাদি মন সব কিছু মেনে নিতে পারতো না বলে সংস্কারের প্রয়োজন অনুভব করতো।

 

সম্রাট বাবুরের জীবনী জানতে পড়ুনঃ সম্রাট বাবর, এক সম্রাজ্য প্রতিষ্ঠাতা

কর্ম জীবনঃ

 

১৮০৩ সালের দিকে রাজা রামমোহন রায় সরকারি চাকরিতে কেরানী পদে যোগদান করেন। কর্ম জীবনের শুরুর দিকে সে চাকরি নিয়ে সুখি ছিলেন না, কারন তিনি দেওয়ানী পদের আশা করেছিলেন ,হলেন কেরানী!!! প্রথম তিন বছর তিনি রামগড়ে ছিলেন, এক বছর কাল ভগলপুরে চাকরি করার পর রংপুরে চলে যান। রংপুরে তিনি পাচ বছর ছিলেন। 

 

রাংপুরে থাকা কালে সে চাকরি স্তফা দিয়ে গ্রামে চলে আসেন। এখানে এসে পৈতৃক ব্যাবসা শুরু করেন।

 

ব্রাহ্ম সমাজ প্রতিষ্ঠাঃ

 

বৌদ্ধ ধর্ম সম্পর্কে জ্ঞান লাভের পরে ভারতে ফিরে আসলেও , সব মিলিয়ে রাজা রামমোহন রায় একেশ্বর বাদের দিকে ঝুকে ছিলেন। রংপুরে থাকার সময় থেকেই সে তার মতবাদ প্রচার করতেন। গ্রামে আসার পরে তিনি তার কাছের মানুষদের নিয়ে একটা দল গঠনের চেষ্টা করেন। সন্ধ্যার পরে তাদের নিয়ে আলোচনায় বসতেন, বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করতেন। এদের নিয়েই তিনি একটা আত্ত্বিয় সভা গড়ে তোলেন যা পরবর্তিতে ব্রাহ্মসভা বা ব্রাহ্ম সমাজ নামে পরিচিতি পায়।

 

প্রথম দিকে ব্রাহ্ম সমাজ তেমন প্রচার ও সাধুবাদ না পেলেও রাজা রামমোহন রায় ভেংগে পরেন নি। প্রতি সন্ধ্যায় তার সভা উচ্চ বাক্য বিনিময় দিয়ে শেষ হলেও সে তার লক্ষে অবিচল ছিলেন। এর পর কিছু উচ্চ বর্গীয় মানুষ তার বন্ধু হন ও ব্রাহ্ম সমাজে জোগ দান করেন, এদের মধ্যে দ্বারকা নাথ ঠাকুরপ্রশন্ন কুমার ঠাকুর অন্যতম ছিলেন।

 

১৮২৮ সালে ব্রাহ্ম সমাজ সংগঠনের রুপ নেয়। রাজা রামমোহন নিজে প্রধান থেকে তারাচাদ চক্রবর্তীকে সাধারন সম্পাদক করেন। কমল বসুর বাড়ি ভাড়া করা হয় উপাশনালয় তৈরি করার জন্য। এই উপাসনালয়ের মাধ্যমে ব্রাহ্ম সমাজ প্রাতিষ্ঠানিক রুপে প্রথম আত্ত্ব প্রকাশ করে।

 

রাজা রামমোহন রায়ের ব্রাহ্ম সমাজের মঞ্চ
রাজা রামমোহন রায়ের ব্রাহ্ম সমাজের মঞ্চ; Image: https://www.tripadvisor.com/

 

সতীদাহ প্রথা বন্ধঃ

 

ততকালীন সমাজে ব্রাহ্মন সমাজে অনেক কুপ্রথা চালু ছিলো। এর মধ্যে সব থেকে জঘন্য ছিলো সতীদাহ প্রথা। কোন ব্রাহ্মন পুরুষ মারা গেলে তার চিতায় তার স্ত্রীদের জ্যান্ত পুরিয়ে মারা হতো। এই জ্যান্ত পুরুয়ে মারার প্রথা কে সতীদাহ প্রথা বলা হয়। তখন বিধবা বিবাহ আইন ছিলো না, তাই এই বিধবা নারী কিভাবে সংসার করবে এই চিন্তায় ও স্বামীর সাথে স্বররগ লাভের লোভে সতীদাহ করা হতো।

 

রাজা রামমোহন রায় এই জঘন্য প্রথা বন্ধ করার জন্য সর্ব প্রথম আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ নেন। তিনি সব সময় সতীদাহ প্রথা বন্ধের জন্য সচেষ্ট ছিলেন। ধারনা করা হয়, তার বড় ভাই জগতমোহন মারা যাবার সময় তার স্ত্রীকে সতীদাহ করা হয়। বৌদির এই অকাল ও নিষ্ঠুর মৃত্যু কিশোর রামমোহনের মনে এক গভীর প্রভাব ফেলে। তখন থেকেই তিনি এই জঘন্য প্রথা বন্দে জন্য প্রতিজ্ঞা বদ্ধ হন।

 

তিনি তার ব্রাহ্ম সমাজে এই সতীদাহ প্রথা বন্ধ করার জন্য বক্তিতা দিতেন। তিনি এর কুফল ও এর নির্মমতা নিয়ে কথা বলতেন। এর জন্য অনেক প্রভাবশালী লোক তার ব্রাহ্ম সমাজ ছেড়ে চলে জান ও এর বিরিধিতা করেন। কিন্তু তিনি তার কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন। এই সময়ে তার অন্যতম সহজোগি ছিলেন দ্বারকানাথ ঠাকুর।

 

শত বাধা বিপত্তি পেরিয়ে অবশেষে ১৮২৯ সালের ৪ ডিসেম্বর বৃটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিতে সতীদাহ প্রথা বন্ধ ঘোষনা করা হয়। রাজা রামমোহন রায় ইংরেজ সরকারকে বুঝাতে সক্ষম হন যে, সতীদাহ কোন ধর্মিয় প্রথা নয়। হিন্দু ধর্মের কোন জায়গায় এই প্রথার সম্পক্ষে লেখা নেই। এটা মন গড়া,কাল্পনিক ও নারীদের জন্য নিষ্ঠুর এক প্রথা।

 

আইন পাশ হবার পরেও বড় বড় হিন্দু ব্রাহ্মন নেতারা এই আইনের বিরুদ্ধে আপিল করে ও এটা তাদের ধর্মিয় আচার ,এতে ইংরেজ সরকারের নাক গলানো ঠিক হয়নি বলে আদালতে বলতে থাকে। ১৮৩০ সালের ৮ জুন রাজা রাধাকান্ত দেব, ভবানিচরন বন্দপাধ্যায়, রামকমল সেনের মতো ধর্মীয় নেতারা ধর্ম সভা নামে একটা প্রতিবাদ সংগঠন গড়ে তোলে।

 

তারা আদালতে আপিল করার পর ১৮৩২ সালে প্রিভি কাউন্সিল বাংলার গভর্নর লর্ড উইলিয়াম ১৮২৯ সালের অধ্যাদেশ বহাল রেখে সতীদাহ প্রথা বন্ধ করে দেন। এর পর আশেপাশের শহর ও অঞ্চলে এই কু প্রথা বন্ধ হতে থাকে। আস্তে আস্তে উপমহাদেরশ থেকে চির বিদায় নেয় এক জঘন্য ও নিষ্ঠুর প্রথা।

 

সতীদাহ করার কল্পীত চিত্র
সতীদাহ করার কল্পীত চিত্র; Image: https://feminisminindia.com/

 

আইয়ামে জাহেলিয়া সম্পর্কে জানতে পড়ুনঃ আইয়ামে জাহেলিয়া, অন্ধকারের যুগ

রাজা উপাধি লাভঃ

 

আমরা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যসাগর কে বাংলা গদ্যের জনক জানলেও অনেকে রাজা রামমোহন রায়কে বাংলা গদ্যের জনক মনে করেন। তিনি মাত্র ১৬ বছর বয়সেই হিন্দু ধর্মের কুসংস্কার নিয়ে বই লিখেন। এর পরে ব্রাহ্ম সমাজ প্রতিষ্ঠার পরে এই সমাজের উদ্দেশ্য ও এর মহাত্ব নিয়ে বই রচনা করেন। খ্রিস্টান ধর্ম ও ব্রাহ্ম সমাজের মধ্যে দ্বন্দ লাগলে সে এর উপরেও বই লেখেন।

 

তার উল্লেখ্য যোগ্য বই হচ্ছে , বেদান্তসার, কেনোপনিষদ, ঈশোপনিষদ, কঠোপনিষদ ইত্যাদি।তিনি প্রায় ৩০ টি বই রচনা করেছিলেন।

 

রাজা রামমোহন রায় উপমহাদেশে নেটিজেনদের সাথে বৈষ্যম্য মূলক আচরন নিয়েও প্রতিবাদ করেছিলেন। শিক্ষা ব্যাবস্থায় স্থানীয়দের অনাধিকার নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি হিন্দুদের ইংরেজি ভাষায় শিক্ষা লাভের জন্য উদ্ভুদ্য করেছিলেন। তিনি সমাজ সংস্কারকের পাশাপাশি এক জন বিদ্যানুরাগী মানুষ ছিলেন।

 

১৮৩০ সালে তার কাজের অবদানের জন্য তখন কার মুঘল বাদশ সম্রাট দ্বীতিয় আকবর তাকে রাজা উপাধিতে ভূষিত করে সম্মান প্রদান করেন।

 

বিলেত সফর ও মৃত্যুঃ

 

রাজা উপাধি লাভের পর রাজা রামমোহন রায় সমাজের নিষেধাজ্ঞাকে উপেক্ষা করে বিলেত সফরে চলে যান। তার সফরের উদ্দেশ্য ছিলো নতুন দেশ দেখা, জ্ঞান অর্জন, সতীদাহ প্রথা বন্ধের পক্ষে সরকারকে উদ্ভুদ্য করা ও ইংরেজ ও ভারতীদের মধ্যে যে বৈষ্যময় ছিল তা কতৃপক্ষের কাছে তোলে ধরা। ইংল্যান্ড সফর শেষে তিনি ফ্রান্স ভ্রমনে যান। 

 

১৮৩২ সালে আবার তিনি ইংল্যান্ড ফিরে এসে ব্রিস্টল শহর ঘুরতে যান। সেখানে সে অসুস্থ হয়ে পরে। ১৮৩২ সালের ২৭ সেপ্টেম্বার এই মহা মনষী মাত্র ৬২ বছর বয়সে মৃত্যু বরন করেন। তার মৃত্যুর ১০ বছর পরে তার বন্ধু দ্বারকানাথ তার সমাধি সৌধ তৈরি করে দেন।

 

রাজা রামমোহন রায় বাংলার ইতিহাসের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তার দেখানো আলোয় এখনো পথ চলেন সমাজ সংস্কারকরা। তিনি আমাদের সমাজ কে কুসংস্কার মুক্ত করার জন্য কাজ করে গেছেন জীবন ভর। তার কাজের সুফল আমরা এখনো ভোগ করতেছি। তিনি উপমহাদেরশের রেনেসা যুগের অন্যতম সদস্য ছিলেন। 

 

Featured Image: https://channelhindustan.com/

 

তথ্য সূত্রঃ উকিপিডিয়া, বি বি সি নিউজ, সব বাংলায় ও বিবিধ গ্রন্থ ও প্রবন্ধ

 

আরো বিবিধ বিষয়ে জানতে পড়ুনঃ ২ টি হারিয়ে যাওয়া শহরের গল্প, ইতিবাচক চিন্তা করার কৈশল ও উপকারিতা, বাটারফ্লাই ইফেক্ট

 

ইতিহাস